খুলনা স্টিল সাইলোতে গম পাচার মুল আসামীর নাম বাদ দিয়ে বাদির মামলা, আটক-২
খুলনার মহেশ্বরপাশা খাদ্য গুদামের অভ্যন্তরে অবস্থিত খাদ্য অধিদপ্তরের স্টিল সাইলো থেকে দুই ট্রাক সরকারি গম পাচারের ঘটনায় মুল হোতাকে বাদ দিয়ে মামলা দায়ের হয়েছে।
সাইলো সুপার অরুপ কুমার মিশ্র বাদী হয়ে এইচ এম আল ইমরান ও মোঃ রাজিবকে এ মামলায় আসামি করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) দণ্ডবিধির ৩৮০/৫১১ ধারায় মামলাটি দৌলতপুর থানায় মামলাটি রুজু হয়।
সাইলোর অভ্যান্তরে সরকারি খাদ্য শস্য (গম) জোর করে পাচারের ঘটনায় সাইলোর কর্মকর্তাদের দায়ীত্ব অবহেলা এবং নিরাপত্তা কর্মীদের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অবাক করা বিষয় হচ্ছে গম পাচারের ঘটনায় প্রতক্ষ্যদর্শীদের তথ্যমতে দৌলতপুর থানার পুলিশ মহেশ্বরপাশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ আরিফ হোসেনকে আটক করেন। কিন্তু রহস্যজনক ভাবে সাইলো সুপার আরিফ হোসেনের নাম বাদ দিয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, মহেশ্বরপাশা স্টিল সাইলোতে ২ নভেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে অজ্ঞাতনামা কয়েকজন ব্যক্তি দুটি ট্রাক নিয়ে সাইলোর ভেতরে প্রবেশ করে এলইউএ রেজিস্টার খাতায় কোনো তথ্য লিপিবদ্ধ না করেই ২ টি ট্রাকে গোডাউনে সংরক্ষিত বস্তাভর্তি লোড করে ত্রিপল দিয়ে বেঁধে ফেলে তিন নম্বর ট্রাকে গম লোড করার সময় সাইলোর অপারেটর প্রদীপ কুমার মণ্ডল তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চাইলে তাঁরা কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। প্রশ্ন হচ্ছে নিরাপত্তা বিভাগে সংরক্ষিত রেজিস্ট্রার খাতায় ট্রাক তিনটি নম্বর লিপিবদ্ধ না হয়ে দুইটি ট্রাকে আটশত বস্তা গম লোড ও তিন নম্বর ট্রাকে কিছু সংখ্যক বস্তা লোড করার পর্যাপ্ত সময় ওই পাচার করা চক্রটি পেয়েছে। লোড করা স্থান এবং পাচারের সাথে জড়িত কারা এদের সিসি ফুটেজ গায়েব করে দিয়েছে। পরে পুলিশ সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে বিভিন্ন তথ্য উপাথ্য সংগ্রহ করে ট্রাক তিনটি জব্দ করেন।
এজাহারে সুত্রে জানাযায়, খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে গম লোডের চেষ্টায় থাকা ব্যক্তিরা ট্রাক ফেলে পালিয়ে যায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সরকারি গম ভর্তি খুলনা মেট্রো-ট-১১-১১০৯ এবং যশোর মেট্রো-ট-১১-২০০ নম্বরের ট্রাক দুইটি পুলিশের হেফাজতে নেয়। প্রতিটি ট্রাকে আনুমানিক ৪০০ বস্তা করে মোট ৮০০ বস্তা গম ছিল। গম পাচারের চেষ্টার পর প্রতক্ষ্যদর্শী এক অস্থায়ী কর্মচারীর দেয়া তথ্য এবং সচল সিসি ফুটেজ পর্যালোচনা করে মহেশ্বরপাশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ আরিফ হোসেনকে গভির রাতে তার বাসভবন থেকে আটক করে। ৩ নভেম্বর বিকেলে মহেশ্বরপাশায় খুলনা স্টিল সাইলো পরির্দশনে আসেন খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (চলাচলা সাইলো) মোঃ আঃ সালাম। এ সময় খুলনা খাদ্য বিভাগের ও প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ সময় বৈঠক করেন তারা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে খাদ্যা অধিদপ্তরের পরিচালক মোঃ আঃ সালাম, খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা আবু নঈম মোহাম্মদ সফিউল আলম তড়িঘড়ি করে সভাস্থল ত্যাগ করেন। পুলিশ সেখান থেকে ইলেক্ট্রিক টেকনিশিয়ান ও ঘটনার পরিকল্পনাকারী এইচ এম আল ইমরান এবং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আরিফ হোসেনের ছোট ভাই মোঃ রাজিবকে আটক করে।
এদিকে বুধবার (৪ নভেম্বর) মহেশ্বরপাশা স্টিল সাইলো ও খাদ্য গুদাম (সিএসডি) অভ্যন্তরে শ্রমিকদের প্রবেশ করতে দেখা যায়নি। বন্ধ রয়েছে খাদ্যশস্যের লোড-আনলোড কার্যক্রম। ফলে গুদামের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোরাদুল ইসলাম জানান, মহেশ্বরপাশা মানিকতলা স্টিল সাইলো থেকে দুই ট্রাক গম পাচারের চেষ্টার ঘটনায় খাদ্য অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষে সাইলো সুপার বাদী হয়ে মামলা করেছেন। সাইলোতে সিসি ক্যামেরা থাককা সত্ত্বেও অজ্ঞাত নামা আসামি করে মামলার বিষয়টি রহস্য জনক মনে করেন সংশ্লিষ্ট মহল। ফুটেজ দেখে কারা এ গম পাচার করার চেষ্টা করেছে তাদের সনাক্ত করে নাম দেয়া সম্ভব ছিল। এবিষয়ে সাইলো সুপার সদুত্তর দিতে পারেন নি। কর্মকর্তাদের সংবাদে দৌলতপুর থানার ওসি মোঃ মোরাদুল ইসলাম ঘটনা স্থলে সিসি ফুটেজ, বিভিন্ন তথ্যর মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে শ্রমিক ইনিয়নের সভাপতি মোঃ আরিফ হোসেনকে আটক করেন। এতে শ্রমিকরা ক্ষিপ্ত হয়ে সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। এক পর্যায়ে ইমরান ও রাজিবকে আটক করে নিয়ে আসার সময় শ্রমিকরা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে। সাইলোর প্রধান ফটকের সামনে শ্রমিকরা জড়ো হয়ে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার ও মারমুখি আচারন করে প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে সাইলোর গেট থেকে বের হতে বাঁধাদেন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে অবরুদ্ধদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। এত ঘটনার পরে ইউনিয়নের সভাপতির নাম মামলায় রহস্যজনক ভাবে বাদ দিয়েছে বাদি অরুপ কুমার মিশ্র। নাম প্রকাশ না করার সর্তে সাইলোর এক কর্মকর্তা জানান, আরিফ ও ইমরানের কর্মকান্ডে তারা অতিষ্ঠ। সাইলোর মালামাল চুরি, গাছ কেটে নেওয়া, গাছের ফাঙ্গাস বিক্রি করা, প্রতিনিয়ত ক্ষমতার অপব্যবহার করেন তারা। গম পাচারের সময় আরিফ ও তার ভাইয়ের ভুমিকা তদন্তন করলে তাদের সংশ্লিষ্ঠতা পাওয়া যাবে, কিন্তু মামলা থেকে আরিফের নাম বাদ দেওয়ায় কর্মকর্তরা সেফ থালেও শ্রমিকদের কাছে ওসি সহ পুলিশকে বিতর্কিত করা হয়েছে। নানা ভাবে বাজে মন্তব্য করা হচ্ছে দৌলতপুর থানার পুলিশকে নিয়ে। তিনি অভিযোগ করে আরো বলেন শ্রমিক নেতাদের সাথে কর্মকর্তার গোপন আতাঁত হয়েছে আর বলির পাঠা হয়েছে দৌলতপুর থানার ওসি।
অপরদিকে এ মামলায় আটক মোঃ ইমরান হোসেন ও মোহাম্মদ রাজিবকে আসামি করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।পূর্বের মামলার প্রসঙ্গ
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, আটক এইচএম আল ইমরান নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এর আগে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মালামাল চুরির অভিযোগে একটি সিআর মামলা দায়েরের তথ্য রয়েছে। মামলাটি ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে দাখিল করা হয়। দৌলতপুর থানা,মামলা নম্বর-১০১। দণ্ডবিধির ৩৮১/৪০৬/৪২০/৪৬৮/৪৭১/৫০৬/১০৯ ধারায় দায়ের করা ওই মামলাটি বর্তমানে খুলনা পিবিআই তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
তবে পূর্বের মামলার অভিযোগ এবং স্টিল সাইলোতে গম পাচারের চেষ্টার ঘটনায় দায়ের করা বর্তমান মামলার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। তবে শ্রমিকরা কর্মকর্তাদের নানা বিষয়ে নিয়ের অনিয়ে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছে।