নিটোরে নতুন মাইলফলক, ১১ বছরের শিশুর সম্পূর্ণ উরুর হাড় প্রতিস্থাপন
দেশের চিকিৎসাসেবায় নতুন মাইলফলক অর্জন করেছে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), যা পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত। হাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত ১১ বছর বয়সি এক শিশুর শরীরে প্রথমবারের মতো টোটাল ফিমার রিপ্লেসমেন্ট (Total Femur Replacement) নামের জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছে
প্রতিষ্ঠানটি। শনিবার (১৭ অক্টোবর) নিটোরের অর্থোপেডিক অনকোলজি অ্যান্ড মাস্কুলোস্কেলেটাল টিউমার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা.মো.সিরাজুস সালেহীনের নেতৃত্বে এ অস্ত্রোপচার করা হয়।
চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের মতে, এ অস্ত্রোপচার দেশের অর্থোপেডিক অনকোলজি এবং জটিল অঙ্গ
পুনর্গঠনমূলক চিকিৎসার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। বিশেষ করে, হাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের জটিল চিকিৎসা দেশেই দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।অস্ত্রোপচারের রোগী ১১ বছর বয়সি সিদরাতুল মুনতাহা। তার বাড়ি চাঁদপুরের উত্তর মতলব এলাকায়। সে দীর্ঘদিন ধরে ইউইং সারকোমা (Ewing Sarcoma) নামের এক ধরনের হাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ছয়টি কেমোথেরাপি সেশন সম্পন্ন করেছে শিশুটি। তবে ক্যান্সারে আক্রান্ত উরুর হাড় ভেঙে যাওয়ায় তার চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে পড়ে। হাড়ের ব্যাপক ক্ষতি ও রোগের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসকেরা বিশেষায়িত পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।টোটাল ফিমার রিপ্লেসমেন্ট পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ ফিমার বা উরুর হাড়ের পরিবর্তে বিশেষ ধরনের কৃত্রিম ইমপ্লান্ট স্থাপন করা হয়। এটি অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচার।এ ধরনের চিকিৎসায় সূক্ষ্ম পরিকল্পনা,বিশেষায়িত দক্ষতা এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক দলের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। অস্ত্রোপচারের অন্যতম লক্ষ্য হলো ক্যান্সারের চিকিৎসার পাশাপাশি আক্রান্ত অঙ্গের কার্যকারিতা ও ভবিষ্যতে চলাচলের সম্ভাবনা যতটা সম্ভব বজায় রাখা।
অস্ত্রোপচার দলের নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক ডা.মো. সিরাজুস সালেহীন। দলের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক ডা. সাঈদ মাহমুদ তমাল, সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম পারভেজ আহমেদ (সোহেল), সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুল হক, সহকারী অধ্যাপক ডা.আনোয়ারুল কবির খান,ডা.মো. শামসুল আলম, ডা.এস কে আতিকুর রহমান,ডা. মো.কামরুজ্জামান, ডা. নাজমুল আলম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডা. জানে আলম মামুন,ডা. আরিফ,ডা.ফেরদৌস ও ডা.রাকিবসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
পুরো কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন নিটোরের পরিচালক অধ্যাপক ডা.মো.আবুল কেনান। তাঁর সার্বিক সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ
জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর হাড় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা প্রচলিত পদ্ধতিতে হাড় পুনর্গঠন সম্ভব না হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে টোটাল ফিমার রিপ্লেসমেন্টের প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের অস্ত্রোপচারের পর রোগীর সুস্থতা, ক্যান্সারের নিয়ন্ত্রণ,অঙ্গের কার্যকারিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে নিয়মিত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।নিটোরে এ ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়া দেশের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার বিকাশে আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে হাড় ও মাংসপেশিসংশ্লিষ্ট জটিল টিউমারের চিকিৎসায় দেশীয় চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুটির চিকিৎসায় এ উদ্যোগ আধুনিক অর্থোপেডিক অনকোলজি সেবার অগ্রযাত্রায় নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সুস্থতা, ক্যান্সারের অবস্থা এবং পুনর্বাসনের অগ্রগতি সম্পর্কে পরবর্তী চিকিৎসা পর্যবেক্ষণই হবে তার দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।